আমার সম্পর্কে

আমি কোন লেখক বা সাহিত্যিক নই। সমাজের গোঁড়ামি বা কুসংস্কার যখন মানুষের মনকে বিষিয়ে তোলে এবং তার থেকে যখন কোন নির্দিষ্ট সমাজ বা গোষ্ঠীর ক্ষতি সাধন হয় তখনই কোন না কোন ব্যক্তি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সমাজের ঐ ভণ্ডামি বা খারাপ কাজগুলোকে আঙ্গুল দিয়ে তুলে ধরতে চায়, আমি তাদের মধ্যে একজন।

আমি শিপলু কুমার বর্মন, নেত্রকোনা জেলার সদর উপজেলায় জন্মগ্রহন করি ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে। আমরা ১০ ভাই-বোন। আমি ভাইদের মধ্যে সবার ছোট। আমার পিতা রমেশ চন্দ্র বর্মন ২০০৩ সালে ব্রেইন স্ট্রোক করে পরলোক গমন করেন। তার পর থেকেই আমার বড়ো ভাইয়েরা আমার মাতা সুনীতি রানী বর্মন কে নিয়ে অতি কষ্টে সংসারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী পড়াশুনার সুযোগ করে দেন।

আমি আমার প্রাইমারি পড়াশুনা শেষ করি নাগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৯ সালে এবং পরে নেত্রকোনা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক এবং নেত্রকোনা সরকারি কলেজ থেকে ১৯৯৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক সফলতার সাথে পাশ করি। অনেক আশা ও স্বপ্ন নিয়ে ভারতের বেঙ্গালুরু গিয়ে ২০০১ সালে সফলতার সহিত বি এস সি কম্পিউটার সাইন্স ডিগ্রী অর্জন করি এবং বাংলাদেশে ফিরে আসি। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে ঢাকা ইপিজেডে একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবে যোগদান করি। এটা ছিল আমার জীবনের প্রথম জব এবং সেই সাথে সমাজের কলুষিত চেহারার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে শুরু করি। আট মাসের মাথায় ঐ কোম্পানি ছাড়তে বাধ্য হই মানুষিক এবং শারীরিক অত্যাচার, যোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্বের অভাব এবং অল্প বেতনে অমানুষিক পরিশ্রম করার জন্য। তারপর আমার এক আত্মীয়ের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করা শুরু করি এবং পাশাপাশি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে এম এস সি ইন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম ডিগ্রি লাভ করি ২০০৮ সালে। পড়াশুনা ও কাজের পাশাপাশি ভালো জবের সন্ধান করেছি অনেক বছর। হিন্দু মাইনরিটি হওয়ার জন্য অনেক ইন্টারভিউ বোর্ডে লাঞ্ছনার শিকার হয়েছি। শুধু তাই নয় হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস করার কারনে বাসা ভাড়া পেতেও অনেক লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। তাই মনে মনে ঠিক করলাম এমন একটা দেশে যেয়ে জীবনের বাকিটা সময় অতিবাহিত করবো যেখানে থাকবেনা হিংসা, বিদ্বেষ, মানুষিক বা শারীরিক নির্যাতনের মতো অপরাধ। আর তাই ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে পারি জমাই। যুক্তরাজ্যে বসবাস করা অবস্থায় ২০১৫ সালে অ্যাংলিয়া রাসকিন ইউনিভার্সিটি থেকে এম এ ইন মার্কেটিং এন্ড ইনোভেশন ডিগ্রি লাভ করি।

নেত্রকোনা সদর উপজেলার নাগড়া গ্রামে আমার জন্মের অনেক আগে থেকেই আমার পিতা মাতা বসবাস করে আসছেন। নাগড়া গ্রামটি এক সময় অনেক সুন্দর ছিল। চারিদিকে সবুজ সবুজ ফসলের মাঠ এবং মগড়া নদী ঘেরা গ্রামটি দেখতে কতই না ভালো লাগতো। আমার শৈশব এবং কৈশোর দুরন্তপনার মধ্য দিয়ে এই গ্রামের বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের পেশাজীবী মানুষের সঙ্গে বেড়ে উঠি। তখনকার সময় ধর্মের ও বর্ণের পেশাজীবী মানুষের মধ্যে একই রকম ভ্রাতৃত্ববোধ ছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সমাজের সেই মানুষ গুলোর সঙ্গে ব্যবধান ও মত প্রকাশের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এটা শুধু আমাদের গ্রামের চিত্র না, এই রকম চিত্র বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। মনে হয় কি যেন একটা অপরিচিত সমাজে বসবাস করছি যেখানের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। নেই কোন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করার স্বাধীনতা।

গত ১৫-২০ বছর ধরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন, অগ্নি সংযোগ, প্রতারণা ও হুমকির হার অতি মাত্রায় বেড়ে গেছে। যার ফলে প্রতিনিয়ত সংখ্যালঘুরা বাংলাদেশে কমে যাচ্ছে এবং দেশে ত্যাগে বাধ্য হচ্ছে। আর এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত মুসলিম সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের কিছু অংশ এবং সরকারি দলের কিছু অসৎ দলনেতা। আমাদের পরিবারও বিভিন্ন ভাবে নির্যাতন, প্রতারণা ও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি বৈরী ভাবাপন্ন সরাসরি স্বীকার করার মতো সৎ সাহস তাদের নেই বা তারা স্বীকার করতে লজ্জা পান। দেশের সরকার ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবার ভয়ে কোন সরকারই এই অপ্রিয় সত্যটাকে মানতে নারাজ। আর এই অপ্রিয় সত্যটাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে আমার এই ব্লগে একটু প্রয়াস বা চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।